বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন
মানবহত্যা একটি জঘন্য অপরাধ ও ভয়াবহ পাপ, যা সম্পর্কে কুরআনের বাণী স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। মানবজীবনের পবিত্রতা এবং এই অপরাধের পরিণতি উপলব্ধি করতে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যদি কেউ কোনো জীবন হত্যা করে অথবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।’ (সূরা মায়িদা-৩২)
এই আয়াতের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের গুরুত্ব এবং হত্যার ভয়াবহতা ফুটে ওঠে। এ মহাপাপের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করেছেন আল্লাহ। কুরআনে এ অপরাধের বিচার ও শাস্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। দুনিয়ার জীবনে হত্যাকারীর জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে এবং আখিরাতে এর শাস্তি হবে আরও ভয়াবহ।
কুরআনে অন্যায় হত্যার শাস্তিস্বরূপ কিসাসের বিধান আরোপ করা হয়েছে। কিসাসের অর্থ হলো—জখমের বদলে অনুরূপ জখম এবং হত্যার বদলে হত্যা। অর্থাৎ, অন্যায়ভাবে কেউ কাউকে হত্যা করলে শরিয়তের বিধান অনুসারে কিসাসের মাধ্যমে হত্যাকারীর শাস্তি কার্যকর করা হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে যাকে হত্যা করা হয়েছে, তার ব্যাপারে কিসাস (-এর বিধান) তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, গোলামের বদলে গোলাম, নারীর বদলে নারী (-কেই হত্যা করা হবে)।’ (সূরা বাকারা-১৭৮)
আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন, ‘আমি তাদের জন্য তাওরাতে এই বিধান লিখে দিয়েছি—প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং প্রত্যেক জখমের বদলে অনুরূপ প্রতিদান। তবে যে ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা গুনাহের কাফফারা হবে। আর যারা আল্লাহর বিধান অনুসারে বিচার করে না, তারা জালেম।’ (সূরা মায়িদা-৪৫)
এ থেকে বোঝা যায়, হত্যার অপরাধ প্রমাণিত হলে এবং নিহতের পরিবার কিসাস দাবি করলে বিচারকের জন্য শাস্তি কার্যকর করা বাধ্যতামূলক। শরিয়তের সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেয়ার অধিকার কারো নেই। এটি কুরআনের সুস্পষ্ট বিধান।
ইসলাম এক অনন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আদর্শ। ধনী-গরিব, ক্ষমতাশালী-দুর্বল, রাজা-প্রজা—সবাই ইসলামের চোখে সমান। অপরাধী যদি রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি হন, তবুও প্রমাণিত অপরাধের জন্য শাস্তি তাকে পেতেই হবে। ধনী বা প্রভাবশালী হওয়া কাউকে ছাড় দেয়ার কারণ হতে পারে না। ইসলামে অপরাধী যে-ই হোক, তার জন্য ন্যায়বিচারের অধিকার সবার সমান।
জাহেলি যুগে শ্রেণি, বংশ বা সম্পদের ভিত্তিতে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নির্ধারিত হতো। দুর্বলদের ওপর জুলুম করা হতো। কিসাসের বিধানেও ছিল চরম বৈষম্য। ধনী-সম্পদশালীদের দাসদের হত্যার বিনিময়ে দুর্বলদের বিনা কারণে হত্যা করা হতো। আল কুরআন এ ধরনের জুলুম চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে। ঘোষণা দিয়েছে—কিসাস কেবল হত্যাকারীর থেকেই নেয়া হবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর হত্যা সংক্রান্ত কিসাস ফরজ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, গোলামের বদলে গোলাম, নারীর বদলে নারী (-কেই হত্যা করা হবে)।’ (সূরা বাকারা-১৭৮)
যদি কেউ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে এবং নিহতের পরিবার কিসাস দাবি করে, তাহলে মুসলিম বিচারকের দায়িত্ব হবে কুরআনের বিধান অনুযায়ী কিসাস কার্যকর করা। এমন ক্ষেত্রে অন্য কোনো শাস্তি যেমন—আজীবন কারাদণ্ড বা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়ার এখতিয়ার বিচারকের নেই। কারণ, আল্লাহ কিসাসের বিধানকেই ফরজ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার করে না, তারা জালেম।’ (সূরা মায়িদা-৪৫)
মানবহত্যা কুরআনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিসাসের বিধান অপরাধ দমন ও সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহর বিধান মেনে চললেই সমাজে শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।